মাযলুম এক রাষ্ট্রনায়কের কথা

“আম্মু, আমি নানার মতো হবো”। আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট দারস শুনে মাকে এমনটাই বলতেন বালক উমার ইবন আবদিল আযিয রাহি:। (উল্লেখ্য যে, উমার ইবন আবদিল আযিয এর মা ছিলেন ইসলামের দ্বীতিয় খলিফা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর পৌত্রী। সে হিসাবে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নানা হতেন)। 

আল্লাহ উমারের বাল্যবয়সের তামান্নাকে পুর্ণ করেন এবং তার মাধ্যমে পৃথিবী আবারও এ অকাট্য সত্য প্রত্যক্ষ করে যে, আসলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে মানবতার কল্যাণ ও মুক্তির জন্য। কোন ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠির আরাম আয়েশের নিমিত্ত এ দ্বীনের আগমন নয়। দুনিয়াবাসী আরও অবলোকন করে যে, মানুষকে মানুষের গোলামী বা দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে যে দ্বীন বা জীবন বিধান সফলতার দাবী করতে পারে তার নাম ইসলাম। 

মাত্র ত্রিশ মাসে তিনি তার গোটা সাম্রাজ্যের প্রতিটি শাখা প্রশাখা থেকে রাজতন্ত্রের ষাট বছরের পুঞ্জিভুত সকল আবর্জনা ও যুলুমের আখড়াগুলো পরিস্কার করে ফেলেন। ন্যায় ও ইনসাফের সুয আবারও উদিত হয় এবং তা প্রায় অর্ধ পৃথিবীকে আবারও আলোতে আলোতে ভরে দেয়। 

শাসনভার গ্রহন করার সাথে সাথেই তিনি যে পদক্ষেপগুলো নেন তা ইতিহাসে বিরল। তুলনা করলে কেবলমাত্র আল খুলাফা আর রাশিদিনের সাথেই করা যায়।

তাকে পাহারা দেয়ার জন্য দেহরক্ষী বাহিনী এগিয়ে এলে তিনি বললেন: সরে যাও আমার কোন দেহরক্ষীর প্রয়োজন নেই। আমি সাধারন মুসলিমদের একজন।

তার জন্য রাষ্ট্রিয় বাহন আনা হলে তিনি তার নিজের খচ্চর আনিয়ে তাতে আরোহন করলেন আর খাদেমকে বললেন: এই বাহন ও পশুগুলো শামের বাজারে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ রাষ্ট্রীয় বাইতুলমালে জমা দাও।

বানু উমাইয়ার শাসকগন অন্যায়ভাবে যেসব প্রজাদের অর্থ সম্পদ ও ভু-সম্পত্তি দখল করেছিলো তিনি তা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করেন। সবপ্রথম তিনি তার স্ত্রী ফাতিমা বিনতু আবদিল মালিককে বলেন: “যদি তুমি আমার সংগ চাও তাহলে তোমার যাবতীয় অর্থ সম্পদ ও অলংকারাদি মুসলিমদের বাইতুলমালে জমা দাও। কারন এসব কিছু তাদের। আমি, তুমি ও এসকল সম্পদ একই গৃহে থাকতে পারেনা। আল্লাহর কসম! আমি হারাম পন্থায় কাউকে কিছু দেবোনা, আবার কারোর বৈধ অধিকারে বাধাও দেবোনা”।

রাজপরিবারের সমুদয় সদস্যকে একত্র করে তিনি বললেন: হে মারওয়ানের বংশধরগন: সম্মান, মযাদা এবং রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার বিরাট একটি অংশ আপনারা লাভ করেছেন। আমার ধারণা মুসলিম উম্মাহর মোট সম্পদের অর্ধেক বা দুই তৃতীয়াংশ রয়েছে আপনাদের অধিকারে। আল্লাহর কসম! পুববর্তী খলিফাদের না এসব কিছু দেয়ার অধিকার ছিলো, আর না ছিলো আমাদের নেয়ার। এখন আমি সকল ভু-সম্পত্তি তাদের প্রকৃত মালিককে ফেরত দিচ্ছি, আর সে কাজ আমি আমার নিজের থেকে ও আমার পরিবার থেকে শুরু করছি।

এসব দেখে তার খাদেম মুযাহিম বললো: আপনার সন্তানদের জীবিকার কি ব্যবস্থা হবে? উমারের দু’গন্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। বললেন: তাদেরকে আমি আল্লাহর যিম্মায় ছেড়ে দিচ্ছি”।

এভাবে তিনি তার গোটা সালতানাতের শাসন, বিচার ও নিবাহী ব্যবস্থাকে “খিলাফাত আলা মিনহাজ আন নব্যুয়াত” এ রুপান্তর ঘটান। আল খুলাফা আর রাশিদীন এর চুতর্থ খলীফা আলী ইবনু আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর ইনতেকালের পর বাইতুল মালকে খলীফাদের ব্যক্তিগত কোষাগাররুপে বিবেচনা করা হতো। এ কোষাগারের সিংহভাগ অর্থ সম্পদ ব্যয় হতো খলীফা ও তার পরিবার পরিজনদের নিজস্ব প্রয়োজন ও আয়েশী জীবন যাপনের নিমিত্ত। উমার ইবনু আবদিল আযিয (রাহিমাহুল্লাহ) এ ব্যবস্থাকে পাল্টে দেন। তিনি বাইতুল মালকে জনগনের জন্য, জনগনের সম্পদে রুপান্তর করেন। যালিম ও প্রজা নিপীড়ক কর্মকর্তা, কমর্চারীদেরকে তিনি অপসারণ করেন এবং তদস্থলে আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ লোকদেরকে নিয়োগ করেন। 

ঐতিহাসিকগন লিখেছেন: প্রশাসনের সবত্র সৎ ও কল্যানমুখী নেতৃত্বের ফলে কৃষি ও চাষাবাদে প্রাণ ফিরে আসে। যমিনের উবরা শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সবত্র সমৃদ্ধির বাতাস বইতে থাকে। সুলাইমানের আমলে যাকাত নেবার জন্য যেখানে মানুষের লাইন পড়ে যেত উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে যাকাত গ্রহণ করার মতো লোক খুজে পাওয়া ছিল দুস্কর।

শাসকদের ন্যায় পরায়ণতা, নি:স্বার্থ সেবা ও চরিত্র মাধুযে মুগ্ধ হয়ে মাযলুমেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করতে থাকে। ইবনু সা’দ বর্ণনা করেছেন: ‘উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়ে কেবলমাত্র খুরাসানের ওয়ালীর হাতেই ইসলাম গ্রহন করে চার হাজার যিম্মী’।

উমার ইবনু আবদিল আযিযের শাহাদাত:

মাত্র আড়াই বছর ক্ষমতায় ছিলেন ইসলামের এই মহান খাদিম।

দায়িত্ব গ্রহণের পর একবার তিনি তার মায়ের চাচাত ভাই সালিম ইবনু আবদিল্লাহকে (রাহি:)লিখেছিলেন: “আমার জন্য আপনি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে লিখে পাঠান”।

সালিম লিখলেন: তুমি তা অনুসরন করতে পারবে না। 

“কেন”?

“কারন, উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কাজে অসংখ্য সহযোগী পেয়েছিলেন কিন্তু তুমি তা পাবেনা”।

“উমার ইবনুল খাত্তাব তার কাজে অসংখ্য সহযোগী পেয়েছিলেন কিন্তু তুমি তা পাবেনা” – কথাটি অবাস্তব ছিলোনা। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর সময়কাল ও পরিবেশ পরিস্থিতি ছিলো ইসলামী রাষ্টের অনুকুলে। কিন্তু উমার ইবনু আবদিল আযিযের সময়কাল ছিলো এর বিপরীত। দায়ীত্ব গ্রহনের পর প্রতিটি দিন ও রাত তার কেটেছে বিক্ষুব্ধ ঝড় ঝঞ্চার মধ্যে। সবলের নিকট থেকে দুবলের ও যালিমের নিকট থেকে মাযলুমের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তিনি নিজেকে বিপদের মুখে ফেলেন। তার বংশের লোকেরাই ছিলো তার উপর বেশী ক্ষিপ্ত। কারন তিনি তাদের মুখের গ্রাস (প্রকৃতপক্ষে যা ছিলো জনগনের জমি জিরাত) কেড়ে নিয়েছিলেন।

সম্মুখে আনুগত্যের ভান করলেও তারা অপেক্ষায় ছিলো সময় ও সুযোগের। 

উমারের বিশ্বস্ত খাদিম মুযাহিম ইনতিকাল করলে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। সে মুযাহিমের মতো ছিলোনা। উমারের শত্রুরা এ সুযোগকে কাজে লাগায়। ঐতিহাসিকগন লিখেছেন: ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিকের (যে উমারের চাচাত ভাই ছিল) মনে এ ভয় বাসা বাধে যে, উমারের দৃষ্টিভংগী যেরুপ দেখা যাচ্ছে, হয়তোবা উমার সুলাইমানের অসিয়াতনামা বাতিল করে অন্য কাউকে খলীফা নিযুক্ত করবে।

ইবনু কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন: ইয়াযিদ ইবনু আবদিল মালিক উমারের নতুন সেই খাদিমকে এক হাজার দিনার ঘুষ দিয়ে হাত করে। এ খাদিমই তার নখের নীচে বিষ লুকিয়ে রাখে এবং উমারের খাবার পানিতে তা মিশিয়ে দেয়।

উমার অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকগন বিষে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। উমারকে যখন বিষ প্রয়োগের বিষয়টি জানানো হল তখন তিনি বললেন: আমি সেদিনই জানতে পেরেছি যেদিন আমি বিষ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। উমার সে খাদিমের উপর প্রতিশোধ নেয়া দুরে থাক তার বিচারেরও কোন নির্দেশ দিলেননা। তিনি একান্তে তাকে কাছে ডাকলেন এবং সুধালেন: তুমি এরুপ কেন করলে? সে বললো: আমাকে এক হাজার দিনার দিয়ে এরুপ করতে বাধ্য করা হয়েছে। উমার তার নিকট থেকে এক হাজার দিনার উদ্ধার করে তা তৎক্ষণাতই বাইতুল মালে জমা করার নির্দেশ দিলেন আর খাদিমটিকে বললেন: তুমি এখনই পালিয়ে যাও কারন আমার পরিবারের লোকেরা তোমার উপর প্রতিশোধ নিতে পারে।

খৃষ্টান রোম সম্রাট এ বিষ প্রয়োগের খবর শুনে সাথে সাথেই নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পাঠালেন, কিন্তু উমার কোনভাবেই চিকিৎসা নিতে রাজি হলেননা। বস্তুত: তিনি দুনিয়ার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। দিনটি ছিলো ১০১ হিজরীর জুমা রাত্র। তার বয়স তখন ৪০ বছর (তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ৬১ হিজরীতে)। সিরিয়ার হিমস–এ তখন অবস্থান করছিলেন তিনি।

প্রায় বিশ দিন কষ্টভোগ করার পর ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিসর ও হিজাজবাসীকে কাদিয়ে এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহন করেন মাযলুম এই খলিফা। যে আত্বীয় স্বজনদেরকে তিনি কোমর ধরে ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাতে চাইছিলেন, সে আত্বীয় স্বজনেরাই তার কোমরখানি চিরদিনের জন্যে ভেংগে দেয়।

সমাপ্ত

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)