যে উপায়ে আল্লাহ লালনপালন করেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের লালনপালনকারী। কিন্তু এ লালনপালনের কাজটি কি তিনি সহস্তে কিংবা কোনও অলৌকিক উপায় অবলম্বন করে করেন? এর জওয়াব হচ্ছে ‘না’। এ কাজ তিনি কোনও মিরাকল সংঘটন করে করেননা। এমনকি যার কেউ নেই তাকেও তিনি কোনও মোজেযা করে আকাশ থেকে রিযক অবতরণ করেননা। তিনি এটি করেন তারই সৃষ্ট অপর বান্দাদের মাধ্যমে। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে তা-ই প্রত্যক্ষ করছি। আমরা দেখছি, স্রষ্টার সুবিজ্ঞ এ ব্যবস্থাপনার কর্মীরা এ পৃথিবীবাসীর মধ্য থেকেই একদল মানুষ।      

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলো: “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? জওয়াবে রাসুল সা: বললেন: যে ব্যক্তি মানুষের বেশী উপকারে আসে। আবার জিজ্ঞেস করা হলো: কোন কাজ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়? রাসুল সা: বললেন: কোনো ব্যথিত অন্তরকে আনন্দিত করা, কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষকে তার বিপদ থেকে উদ্বার করা, কারোর সাহায্যে একটি দিন অতিবাহিত করা বা শ্রম দেয়া আমার এই মাসজিদে একমাস ইতিকাফ করার চেয়ে উত্তম”। (১) 

পুণ্যময় এ কর্মে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধকরণে কোথাও বলা হয়েছে:

“আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, মৃত্যুর সময় আসার আগেই তা থেকে খরচ করো৷ সেই সময়টিতে কেউবা আকুতি করে বলবে: হে আমার রব, অনুগ্রহ করে আমাকে যদি আরও কিছুটা দিন অবকাশ দিতে। তাহলে আমি দান করতাম এবং নেককার লোকদের মধ্যে শামিল হয়ে যেতাম৷ অথচ যখন কারোর চিরবিদায়ের সময়ক্ষণ এসে যায় তখন আল্লাহ তাকে আর কোন অবকাশ মোটেই দেন না৷ তোমরা যা কিছু কর সে বিষয়ে আল্লাহ পুরোপুরি অবহিত৷ (২) 

আবার কোথাও বলা হয়েছে:

“তোমাদের মুখ পূব দিকে বা পশ্চিম দিকে ফিরাবার মধ্যে কোন পুণ্য নেই৷  বরং প্রকৃত পূণ্য হচ্ছে এই যে, মানুষ আল্লাহ, কিয়ামতের দিন, ফেরেশতা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব ও নাবীদেরকে মনে প্রাণে মেনে নেবে এবং আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের প্রাণপ্রিয় ধন-সম্পদকে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন,মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাসদের মুক্ত করার জন্য ব্যয় করবে৷ আর নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দান করবে ৷ যারা অংগীকার করে তারা তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে-মুসিবাতে, অভাবে-অনটনে ও হক–বাতিলের সংগ্রামে সবর করবে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সৎ ও সত্যাশ্রয়ী এবং এরাই মুত্তাকী”৷ (৩)  

জাহান্নামে যাবার কারনগুলো উল্লেখ করে কোথাও সতর্ক করা হয়েছে এভাবে:

“জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত লোকদের জিজ্ঞেস করা হবে, কি কারনে তোমরা জাহান্নামে এলে? তারা বলবে, আমরা নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলামনা এবং অভাবীদের খাবার দিতামনা। (৪)

কোথাও বলা হয়েছে:

“কিয়ামাতের দিন আল্লাহ বলবেন, ওহে আদাম সন্তান! আমিতো তোমার নিকট খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাবার দাওনি, বান্দা বলবে: আপনি সারা বিশ্বের রব, আমরা আপনাকে কিভাবে খাবার খাওয়াব? এটি কিভাবে সম্ভব? আল্লাহ বলবেন: তোমার নিকট কি অমুক খাবার চায়নি? তুমি যদি তখন তাকে খাবার দিতে তাহলে আজ তা আমার নিকট পেতে......”(৫) 

কোথাও বলা হয়েছে: “ঐ ব্যক্তি মু’মিন নয়, যে পেট পুরে আহার করে অথচ সে জানে যে, তার প্রতিবেশী অভুক্ত” (৬)

আবার কোথাও বলা হয়েছে:“খরচ কর হে আদাম সন্তান! তোমার জন্যও খরচ করা হবে”। (৭)

কোথাও এসেছে: 

“দেখো, তোমাদেরকে আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে আহবান জানানো হচ্ছে অথচ কিছু লোক কৃপণতা করছে৷ যারা কৃপণতা করছে তারা প্রকৃতপক্ষে নিজের সাথেই কৃপণতা করছে৷ আল্লাহ তো অভাব শূন্য৷ তোমরাই তার মুখাপেক্ষী৷ তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আল্লাহ তোমাদের স্থানে অন্য কোন জাতিকে নিয়ে আসবেন৷ তারা তোমাদের মত হবে না”৷ (৮)  

“হে নবী! আমার যে বান্দারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলে দাও, তারা যেন নামায কায়েম করে এবং যা কিছু আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে (সৎপথে) ব্যয় করে সেই দিন আসার আগে যেদিন না বেচা-কেনা হবে আর না হতে পারবে বন্ধু বাৎসল্য”৷ (৯)  

একবার উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) লক্ষ্য করলেন যে, একব্যক্তি সারাক্ষণ মাসজিদে নামায ও তাসবিহ তাহলিলে রত রয়েছে। কখনো বাইরে যায়না। উমার রা. জিজ্ঞেস করলেন: তোমার আহারের ব্যবস্থা করে কে? সে জওয়াব দিল: আমার ভাই। তখন উমার রা. বললেন: তাহলে তোমার ভাই তোমার চেয়ে উত্তম।  

শুধু তা-ই নয়। আল্লাহর এই দুনিয়ায় কোনো মাখলুক যাতে তার মৌলিক দাবী ও চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত না থাকে বা তার চাহিদা পুরণ করতে গিয়ে কষ্টে পতিত না হয় এজন্যে সম্পদ উপার্জন ও ব্যয়ে একটি অতি কড়া ও সুনির্দিষ্ট বিধান দেয় ইসলাম। ইসলাম বলে যে, আকাশ ও যমিনের যাবতীয় সম্পদের নিরংকুশ মালিক হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালা। মানুষ তার আমানতদার মাত্র। হাশর দিবসে সে তার এ আমানতের হক কিভাবে, কোন পন্থায় আদায় বা ব্যবহার করেছে তার পাই পাই হিসাব না দিয়ে এক পা-ও নাড়াতে পারবেনা।   

আমানতের হক আদায়ের পন্থাগুলোর মধ্যে যাকাত একটি। এটি নামায, রোজার মতোই ফরজ। কুরআন কারিমের সবত্র নামায ও যাকাতকে অবিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ যদি এটি (যাকাত) দিতে অস্বীকার করে তাহলে সে আর মুসলিম হিসেবে গন্য হবেনা। 

যে রাষ্ট্র বা সমাজে যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালু থাকে সেখানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাব বলে কিছু থাকেনা। ইতিহাস সাক্ষী যে, উমার ইবনু আবদিল আযিযের (রাহিমাহুল্লাহ) সময়ে যাকাত নেবার মতো দরিদ্র লোক খুজে পাওয়া যেতোনা।

এভাবে এ বিশ্বভুবনের মহান স্রষ্টা নিজে অলক্ষ্যে থেকে মানুষেরই মাধ্যমে মানুষকে লালনপালনের কাজ করেন। 

সুতরাং বড়ো সৌভাগ্যবান তারা যারা এ পূণ্যময় কাজ আঞ্জাম দেবার তাওফিক লাভ করেছে।    

(১)(বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাহকিক: শাইখ আলবানি রাহিমাহুল্লাহ)

(২)(সুরা আল মুনাফিকুন ১০-১১)

(৩) সুরা আল বাকারা ১৭৭

(৪) সুরা আল মুদ্দাস্সির ৪৩-৪৪

(৫) মুসলিম (হাদিসু কুদসী)

(৬) তাবারানি, আল হাকিম। তাহকিক: শাইখ আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ)

(৭) বুখারী, মুসলিম।

(৮) সুরা মুহাম্মাদ ৩৮

(৯) সুরা ইবরাহীম ৩১

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None