স্বামী-স্ত্রীর হক

হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আমাদের প্রতি স্ত্রীদের কি হক? তিনি এরশাদ করলেনঃ
" স্বামীর প্রতি স্ত্রীর হক হলঃ
তোমরা যখন খাবার খাবে, তাদেরকও খাওয়াবে।
যখন বস্ত্র পরিধান করবে, তাদেরকেও পরাবে।
( অন্যায়ের জন্য শাসন করতে গিয়ে ) তাদের মুখ-মন্ডলে আঘাত করবে না।
তাদেরকে অভিশাপ দিবে না।
স্ব-গৃহে ব্যতীত তাদের সাথে মেলামেশা ত্যাগ করবে না।( অর্থাৎ, স্ত্রীর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে স্ব-গৃহ ত্যাগ করবে না। ( আবু দাউদ )
আব্দুল্লাহ ইবনে যাম'আ(রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ
"তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে ক্রীতদাসের ন্যায় প্রহার না করে। কেননা দিবস শেষ হওয়ার পর তার সাথে তাকে শয্যা গ্রহণ করতে হবে। " ( বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী )
আবু হুরায়রা ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এরশাদ করেনঃ " আমি তোমাদেরকে স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা আমার উপদেশ মেনে চল। কেননা নারী জাতিকে বাঁকা হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে।যদি তাদেরকে ( সম্পূর্ণরূপে ) সোজা করতে চাও, তাহলে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। তাদেরকা ভেঙ্গে ফেলার অর্থ হল তালাক প্রদান করা। আর যদি আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও, তাহলে বাঁকাই থেকে যাবে। এজন্য আমি তাদের প্রতি উত্তম আচ্রণ করার উপদেশ দিচ্ছি। " ( বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী )
ফায়দাঃ সোজা করার অর্থ হল, তাদের কোন আচরণই নিজের (স্বামীর) মনের খেলাপ হতে না দেয়া। কেননা এ ব্যপারে চেষ্টা করা নিরর্থক। আর যদি এ নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কর, তাহলে তালাক প্রদানের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এজন্য সাধারণ বিষয়ে স্ত্রীর সাথে উদারতা প্রদর্শন করা উচিত। তাছাড়া অতিরিক্ত কঠোরতা ও রুক্ষ আচরণের ফলেশয়তান মহিলাদের অন্তরে দ্বীন ও শরীয়ত বিরোধী বিভিন্ন কল্পনা ও কুচিন্তা সৃষ্টি করে।
উম্মে সালামা ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও মায়মুনা রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। ইতিমধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাকতুম ( অন্ধ সাহাবী ) উপস্থিত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বললেনঃ" তোমরা উভয়ে পর্দার ভিতরে চলে যাও। আমরা আরয করলাম, তিনি তো অন্ধ মানুষ, না আমাদেরকা দেখেন আর না আমাদেরকে চিনেন। তখন তিনি বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছো না? ( তিরমিযী, আবু দাউদ )
ফায়দাঃ স্ত্রীকে গায়্রে মাহরাম থেকে পর্দার মধ্যে রাখা, যেন একজন অপরজনকে দেখতে না পায়, এটাও স্ত্রীর হক। এতে স্ত্রীর দ্বীন রক্ষা পায় এবং সে পর্দাহীনতার ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়। এতে তার পার্থিব উপকারও রয়েছে। কেননা কোন বস্তুর বিশিষ্টতা যত অধিক হবে, তার প্রতি আকর্ষণও ততো অধিক হবে। পর্দার মধ্যে যেহেতু স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর বিশিষ্টতা অর্জিত হয়, তাই তার প্রতি স্বামীর আকর্ষণও বৃদ্ধি পায়। ফলে স্ত্রীর হক অধিক পূর্ণ হয়। এ থেকে প্রমাণিত হল পর্দা স্ত্রীর পার্থিব কল্যাণ লাভেরও একটি মাধ্যম।
দ্রষ্টব্যঃ পর্দা যেমন সকল গায়রে মাহরামের দৃষ্টি থেকে নারীকে আড়াল করে একমাত্র স্বামীর দৃষ্টির জন্য বিশিষ্ট করে দেয়, তদ্রুপ তার দৃষ্টিকে সকল গায়রে মাহরাম থেকে ফিরিয়ে একমাত্র স্বামীর জন্য বিশিষ্ট করে দেয়। অর্থাৎ, স্ত্রীর প্রতি কেউ তাকাতে পারবে না স্বামী ছাড়া এবং স্ত্রী নিজেও কারও প্রতি তাকাতে পারবে না স্বামী ছাড়া। এটাই স্বামীর প্রতি নারীর বিশিষ্টতার অর্থ।
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) হতে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেনঃ " যদি আমি কারোর প্রতি কোন মানুষকে সিজদা করার হুকুম করতাম, তাহলে স্ত্রীর প্রতি হুকুম স্বামীকে সিজদা করার।"
ইবনে আবী আউফা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন " সেই সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মদের জীবন! স্ত্রী যে পর্যন্ত না আপন স্বামীর হক আদায় করবে, তার প্রতি পালকের হক আদায় হবে না।" ( ইবনে মাজাহ ) ফায়দাঃ শুধু নামায, রোযা আদায় করেই কোন নারী যেন মনে না করে যে, সে মহান আল্লাহর হক আদায় করে ফেলেছে। কেননা স্বামীর হক আদায় করাও আল্লাহ তাআলার একটি হুকুম। সুতরাং, কোন স্ত্রী যে পর্যন্ত স্বামীর হক আদায় না করবে, ততক্ষণ আল্লাহর হক পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় হবে না। আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, সর্বোত্তম নারী কে? উত্তরে তিনি বললেনঃ " ঐ নারী যাকে দেখলে তার স্বামী আনন্দিত হয়, তাকে কোন আদেশ করলে তা পালন করে এবং নিজের ও নিজের সম্পদ সম্পর্কে এমন কিছু করে না যার কারণে তার স্বামী অসন্তুষ্ট হয়।" ( নাসাঈ ) ফায়দাঃ দ্বীনি ও দুনিয়াবী যাবতীয় কল্যাণ সাধিত হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে পরিপূর্ণ ভালবাসা ও সম্পর্ক অটুট থাকা। আর পরিপূর্ণ সম্পর্ক ও ভালবাসা তখনি অটুট থাকবে, যদি স্বামী-স্ত্রী একজন অপরজনের পূর্ণাঙ্গ হক আদায় করে। বস্তুতঃ ইসলাম স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের জন্য যে হক ও অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা পূরণ করার মাধ্যমেই পারিবারিক জীবন সুখকর হতে পারে।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

ধন্যবাদ আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ পোষ্টের জন্য

অনেকঅনেক ভাল লাগলো।

''সাদামেঘ''

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)