আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য

তাওয়াক্কুলের অর্থ আল্লাহ তা’আলার প্রতি নির্ভরতা। তাওয়াক্কুল ঈমানের এক বিশেষ অঙ্গ। তাওয়াক্কুল ব্যতীত কোন মানুষের ঈমান পূর্ণতা লাভ করতে পারে না।

সাধারণতঃ মানুষের পদে পদে অভাব-অভিযোগ, ভয়-ভীতি, আশঙ্কা-অনিশ্চয়তা, সফলতা আসবে কি আসবে না, হতাশা-নিরাশা, ব্যর্থতা-অক্ষমতা ইত্যাদি আসে। এসব ক্ষেত্রে অনেককে লক্ষ্য করা যায় যে, তারা হতাশায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে বা হাল ছেড়ে দেয়। সেসব লোক যেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাকের উপর আস্থা-বিশ্বাস, নির্ভরতা, তাওয়াক্কুল হারিয়ে ফেলে। এটা মারাত্মক গুনাহ ও ঈমানের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুর’আনে এরশাদ করেন- “ তোমরা আল্লাহ পাকের রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না ”।

এজন্য প্রয়োজন- প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর মহান দরবারে কায়মনে মুনাজাত ও ফরিয়াদের মাধ্যমে তাঁর নিকট রহমত, বরকত, নিয়ামত, মদদ, শক্তি ও সাহায্য কামনা করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুর’আনে সুষ্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে- তোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হও, তাহলে কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি ভরসা কর।

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেন- আল্লাহর বান্দাগণ শুধু মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপরই ভরসা করে এবং তাঁর প্রতি নির্ভরশীল হয়। নিঃসন্দেহে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের সব ধরণের নেক মাকসাদ পূরণ করে দেন ( অবশ্য কোনটা দুনিয়াতে না পেলেও বুঝতে হবে তা আখিরাতের জন্য জমা করে রাখা হয়েছে )।

পবিত্র কুর’আনে আরও বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। এমনিভাবে পবিত্র কুর’আনে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আরও বহু আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

তাওয়াক্কুলের বিষয় বুঝার জন্য এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি। প্রথমতঃ হযরত ইবরাহীম ( আলাইহিস সালাম )-এর তাওয়াক্কুলের কথা উল্লেখযোগ্য। হযরত ইবরাহীম ( আলাইহিস সালাম )-কে যখন নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার জন্য চরকাতে বসানো হল, তখন তিনি বললেন-

আমার একমাত্র ভরসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট।

হযরত ইবরাহীম ( আলাইহিস সালাম ) যখন চরকা থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে শূন্যমাঝে ছিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল ( আলাইহিস সালাম ) এলেন এবং তাঁকে বললেন, হে নবী! আমাকে আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি? তিনি বললেন- না নেই। আমি কেবল মহান আল্লাহর উপরই ভরসা করে আছি। এরই বদৌলতে মহান আল্লাহ সেই অগ্নিকুণ্ডকে ফুলের বাগান বানিয়ে দেন।

ইসলামে তাওয়াক্কুল অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার সাথে কাজ-কর্ম করার জন্য বিশেষভাবে তাকিদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হল- চেষ্টাও করতে হবে এবং তাওয়াক্কুলও করতে হবে। তাওয়াক্কুল ব্যতীত শুধু কাজ করে যাওয়া যেমন কাম্য নয়, তেমনি শুধু তাওয়াক্কুল করে বসে থেকে চেষ্টা না করাও ইসলামের শিক্ষা নয়। চেষ্টা ও তাওয়াক্কুল উভয়টাই থাকতে হবে। যেমন- মনে করুন, বাঘ এসে পড়েছে। তখন তার থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা না করা কিংবা কারও রোগ-ব্যাধি হলে চিকিৎসা পরিহার করার মত ধ্যন-ধারণা ও কাজ শরীয়ত সম্মত নয়।

একার একলোক রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর দরবারে সাক্ষাত করতে এলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উট কোথায় রেখে এসেছ? লোকটি বলল, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে ছেড়ে রেখে এসেছি। একথা শুনে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) তাকে বললেন, প্রথমে তুমি উটটিকে কোন স্থানে বাঁধ তারপরে তাওয়াক্কুল কর।

আল্লাহর নবীর একথা কত তাৎপর্যময়। এভাবেই মুমিন মুসলমানের প্রত্যেকটি কাজ শরীয়তের গণ্ডীর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই আমাদের কর্তব্য হল- এই দুনিয়ার জিন্দেগীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে কাজের জন্য যে নিয়ম-বিধি করে দিয়েছেন এবং যে পথ বাতলে দিয়েছেন, তা অবলম্বন করতে হবে। আর তার ফলাফল বা কার্যসিদ্ধিতার জন্য আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে হবে। এমনি করে প্রতিটি কাজেই মহান আল্লাহর উপর ভরসা রাখা আমাদের কর্তব্য।

বস্তুতঃ জগতের কোন কিছুই মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া হয় না। তাই বীজ বুনে আল্লাহ তা’আলার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তিনিই এর মাধ্যমে গাছ ফলাবেন। তেমনিভাবে বিবাহ করে সন্তান হওয়ার জন্য আল্লাহর উপরই তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে হবে।

তদুপরি যদি কখনও সেই কার্যসিদ্ধি না হয়, তখন বুঝতে হবে- এটা ভাগ্যে নেই, তাই হয়নি এবং তখন মহান আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এটাকে ‘রিজা বিল কাজা’ বলে। মুমিন ব্যক্তির জন্য এ উভয়টিই জরুরী এবং এগুলো ঈমানের অঙ্গ বিশেষ।

মোদ্দাকথা, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুনিয়ার কাজ-কর্মের জন্য নিয়ম-নীতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তা অবলম্বন ও অনুসরণ করেই তাওয়াক্কুল করতে হবে। কেননা, স্বাভাবিক বাহ্যিক অবলম্বনগুলোও তো মহান আল্লাহ তা’আলারই প্রদত্ত শক্তি এবং তাঁরই ক্ষমতার দ্বারা হয়। রুজী যদি গোলাভরা থাকে বান্দা যে নিজে ভক্ষণ করতে পারবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? সুতরাং এখানেও তাওয়াক্কুল করতে হবে। আবার দেখুন- গাড়ী, জাহাজ, বিমানে সওয়ার হলেই আপনি গন্তব্যস্থলে নিরাপদে পৌঁছে যাবেন- এর গ্যারেন্টি কোথায়? তাই সেখানেও মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে। এভাবে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি কাজে মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে এবং তাঁর রহমত ও মদদ কামনা করতে হবে।

আবার লক্ষ্য করুন, নৌকা-জাহাজ ডুবে গেল বা বিমান ক্রাস করলো, তখন আল্লাহ তা’আলা আপনাকে যদি হেফাজত করার ইচ্ছা করেন, তাহলে আপনি বেঁচে যাবেন, আবার যদি সেখানে আপনার মারা যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর ফয়াসালা হয়, তাহলে আল্লাহ পাক আপনাকে সেখানে মৃত্যু দিয়ে সেই ফয়সালা বাস্তবায়িত করবেন। মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার পাশাপাশি তাঁর এ উভয় প্রকার ফয়সালাকে মেনে নেয়া এবং এর উপর সন্তুষ্ট থাকা আমাদের কর্তব্য।

অতএব, বুঝতে হবে- দুনিয়ার উপায় পদ্ধতি একটি বাহ্যিক উপকরণ মাত্র। বস্তুতঃ এর প্রতিটি বিন্দুতে বিন্দুতে মহান আল্লাহর মর্জীই কার্যকরী হচ্ছে। কাজেই চলমান জীবনের প্রতিটি কাজে-কর্মে সর্বদা-সর্বাবস্থায় আল্লাহ পাকের উপর তাওয়াক্কুল অর্থাৎ ভরসা ও নির্ভরতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করা প্রত্যেক ঈমানদারের কর্তব্য।

                                     ( একজন আলেমের একটি লেখা থেকে সংগৃহীত )

আল্লাহ তা’আলা আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন। 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)

আপনার দোয়ার সাথে আমিন আমিন আমিন।

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)