কুর’আন ও হাদীসে বিজ্ঞান : পরিপ্রেক্ষিত পবিত্রতা

পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা হলো ইসলামের এমন একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আমল যা অন্য কোন ধর্মে পরিলক্ষিত হয় না। আর পবিত্রতা অর্জনপূর্বকই ইবাদতে দণ্ডায়মান হতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন: ওহে যারা ঈমান এনেছ! যখন তোমরা নামাযের জন্য দন্ডায়মান হও তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাছেহ কর এবং তোমাদের পা’গুলি গিরা পর্যন্ত ধৌত কর। (সূরা মায়েদা, ৫: ৬ আয়াত)। ইসলামে পবিত্রতাকে ঈমানের অঙ্গ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি (সা.) আরো বলেছেন: পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। (মুসলিম) রাসূল সা. বলেছেন : পবিত্রতা ছাড়া নামায গৃহিত হবে না। (মুসলিম)
এই পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এক দিকে যেমন এর মাধ্যমে ইবাদত করা হচ্ছে, সাওয়াব অর্জন হচ্ছে এবং গুনাহ মাফ হচ্ছে অপর দিকে রয়েছে সুস্থতাসহ সার্বিক কল্যাণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমি কি তোমাদেরকে এমন এক জিনিসের সন্ধান দিব না যার দ্বারা আল্লাহ গুনাহ মুছে দিবেন এবং সম্মান বৃদ্ধি করে দিবেন? তারা বললেন : হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেন : সুন্দর ও ভালভাবে অযূ করা, বেশী বেশী মসজিদে গমন করা এবং এক সালাতের পর অন্য সালাতের জন্য অপেক্ষায় থাকা। এগুলি অবশ্যই তোমরা নিয়মিতভাবে পালন করবে। (মুসলিম)
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: যখন কোন মুসলিম অথবা মু’মিন বান্দা অযূ করে, অত :পর তার মুখ মণ্ডল ধৌত করে, পানির সাথে তার চক্ষু দিয়ে যে গুনাহ সংঘঠিত হয়েছে সেই সকল গুনাহ চেহারা থেকে বের হয়; এমন কি সে গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যায়। ( মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
বিজ্ঞান প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামী বিধি বিধান ততই নির্ভুল, সত্য ও সার্বিক কল্যাণকর হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞানে প্রকাশ যে, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য এমন সব ক্ষুদ্র জীবনু আকাশে বাতাসে বিচরণ করছে যা সব সময় মানুষের মুখ, চোখ, নাক, কান, এমনকি লোমকুপসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে।
ডা : মুহাম্মদ তারেক মাহমুদ বর্ণনা করেছেন : অযূর দ্বারা শরীরের ঐ অংশ পরিস্কার হয় যে অংশ শরীরে রোগ বৃদ্ধি ও স¤প্রসারণের প্রধান মাধ্যম। রোগ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে রাখার সহজ পদ্ধতি এটাই যে, ঐ অঙ্গগুলির সংরক্ষণ করতে হবে। অযূ দেহে রোগ ব্যাধি প্রবেশের রাস্তা সমূহের অতন্ত্র প্রহরী।
অযূর পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে উসমান বিন আফ্ফান রা. এর হাদীস উল্লেখযোগ্য। হাদীসটি হলো: তিনি অযূর পানি আনতে বললেন। অত :পর অযূ করলেন। তিনি দুই হাতের কবজি তিনবার করে ধৌত করলেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধৌত করলেন। তারপর ডান হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধৌত করলেন। এমনি ভাবে বাম হাত ধৌত করলেন। অত :পর তার মাথা মাছেহ করলেন । তারপর তার ডান পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধৌত করলেন তারপর এমনি ভাবে বাম পা ধৌত করলেন। অত :পর বললেন : আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার এই অযূর ন্যায় অযূ করতে দেখেছি। (মুসলিম)।
উপরোল্লিখিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী মুখে পানি দিবার পূর্বে দুই হাতের কবজি ভাল করে ধৌত করতে হয়। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বর্ণনা করছে যে, হাতে সাধারণত : ময়লা ও জীবাণু থাকে। মুখে পানি দিবার পূর্বে তা যদি ভাল করে পরিস্কার না করা হয় তাহলে সেই জীবাণু মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞান আরও বর্ণনা করেছে যে, বেশী বেশী কুলি করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মানুষ যখন খাদ্য খায় তখন খাদ্যাংশ দাঁতের ফাঁকে অবশিষ্ট থাকে। এ দিকে ব্যাকটরিয়া নামক ধ্বংসাত্মক ক্ষুদ্র জীবাণু বাতাসের সাথে ঐ সমস্ত খাদ্য কনায় প্রবেশ করে প্রভাব বিস্তার করে। জীবাণুর বংশ বিস্তার এত বেশী যে, এক একটি জীবাণু প্রতি ত্রিশ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে দুইটি করে বাচ্চা জন্ম দিতে পারে।
এমনকি সেই নবজাত বাচ্চাটিও আবার ৩০ সেকেন্ড পর বাচ্চা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। অথচ এই সব ক্ষুদ্র জীবাণু অনুবিক্ষন যন্ত্র ছাড়া খালী চোখে দেখা যায় না। দন্ত রোগের ডাক্তারগণ বলেন, দন্ত রোগের প্রধান কারণ হচ্ছে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যাংশ। এর মাধ্যমে জীবাণু তার বংশ বিস্তার করে দাঁত ও দাঁতের মাড়ীর চরম ক্ষতি সাধন করে। শুধু তাই নয়, বরং থুতুর সাহায্যে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগ ব্যাধির সৃষ্টি করে।
আমরা মুসলিম, আমাদের কাছে রয়েছে চৌদ্দশত বছর পূর্বে মহানবীর শিক্ষা, যার মধ্যে রয়েছে দ্বীন, দুনিয়ার কামিয়াবী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজের পূর্বে অযূর সময় ঘুম থেকে উঠে, বাড়ীতে প্রবেশের সময়, দিনের প্রথম ও শেষ ভাগে, আহারের আগে ও পরে মেসওয়াক ব্যবহার করতেন। আবু হুরায়ইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের যদি কষ্ট না হতো তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের পূর্বে মেসওয়াক করার হুকুম করতাম। (বুখারী ও মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘প্রত্যেক অযূর পূর্বে’। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন স্বীয় বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি মেসওয়াক করতেন। (মুসলিম)।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মেসওয়াক মুখকে পবিত্র রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি আনায়ন করে। (নাসাঈ, বাইহাকী)।
আবু মূসা আল-আশয়ারী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন : আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রবেশ করলাম, তখন তার মুখে মেসওয়াক ছিল। (মুসলিম)
এমন আরও অনেক হাদীস পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে মহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, মানব জাতির সার্বিক সুস্থতার জন্য সদা সর্বদা তিনি মিসওয়াক করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সাথে সাথে অযূর সময় ও খাওয়ার পরেও কুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুলি করা ও নাকে পানি দিতে আদেশ করেছেন। (দারু কুতনী)
বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান বর্ণনা করছে যে, গড়গড়া করে কুলি করার মাধ্যমে টনসিলসহ গলার অসংখ্য রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এমনকি বার বার গলায় পানি পৌঁছানোয় গলাকে ক্যানসার থেকে রক্ষা করে। উপরোক্ত হাদীসে কুলি করার সাথে সাথে নাকে পানি দেয়ার আদেশ করেছেন। অন্যত্র তিনি বলেছেন : তোমাদের কেহ যখন অযূ করবে সে যেন অবশ্যই তার নাকে পানি দেয়, তারপর তা বের করে ফেলে। (বুখারী ও মুসলিম)
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন : তোমরা ভাল ভাবে দুইবার অথবা তিনবার নাকে পানি দিবে। (আবূ দাউদ, মুসনাদে আহমদ)
নাক মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই নাকের মধ্যে এমন একটি যন্ত্র সৃষ্টি করে রেখেছেন যার মাধ্যমে মানব দেহের চির শত্র“ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জীবাণু যখন শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশের চেষ্টা করে তখন সেগুলোকে আটকে দেয়। হামলা প্রতিহত করে ও ধ্বংস করে দেয়। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী মুসল্লী ব্যক্তি কম পক্ষে দৈনিক পাঁচ বার উক্ত নাক পরিস্কার করে। এর ফলে মুসল্লী ব্যক্তিদের স্থায়ী সর্দি, কাশী কিংবা নাকে মারাত্মক ব্যাধি পরিলক্ষিত হয় না।
শায়খ আব্দুল মজীদ ঝান্দানী উল্লেখ করেন : জনৈক মিসরী মহিলা ডাক্তার মিসরের একটি এলাকার জরিপ চালিয়ে তথ্য প্রকাশ করেন যে, মুসল্লী ব্যক্তিদের মাঝে নাকে মারাত্মক ব্যধি পরিলক্ষিত হয় না।
অসবৎরপধহ পড়ঁহপরষ ভড়ৎ নবধঁ :ু সংস্থার সম্মানিত সদস্য লেডী হীচার বলেন : মুসলিম স¤প্রদায়ের কোন প্রকার রসায়নিক লোশন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই, তারা ইসলামী পন্থায় অযূ দ্বারা চেহারার যাবতীয় রোগ থেকে রক্ষা পায়। জনৈক ইউরোপীয় ডাক্তার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম ছিল “চক্ষু-পানি-সুস্থতা”। উক্ত প্রবন্ধে তিনি এ কথার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন যে, নিজের চক্ষুকে দিনে কয়েকবার পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে, নতুবা মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হকে পারে। অথচ চৌদ্দশত বছর পূর্বে থেকে আল কুরআন এমন সব বিধি বিধান নির্ধারণ করেছে যার মধ্যে রয়েছে সর্ব যুগের মানব জাতির সুস্থতাসহ সার্বিক কল্যাণ।
তাই আমরা একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যেখানে অপূর্ণাঙ্গ কোন কিছুর স্থান নেই। আর এজন্যই আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন : “আমি এ কিতাবের মধ্যে সবকিছুই শামিল করে দিয়েছি। আর এটি মু’মিনদের জন্য সুপথ ও রহমত স্বরূপ।” পরিশেষে বলবো যে, আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সবাইকে তার নাযিলকৃত বিজ্ঞানময় কিতাব আল-কুর’আনুল কারীম ও রাসূল সা. এর হাদীসের নির্দেশিত পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ্ খায়ের গবেষণাধর্মী লেখাটির জন্য।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

আপনােক ো ধন্যবাদ কষ্ট কের পড়ার জন্য।

-

মোঃ আবুল খায়ের

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)