কে আমাকে মনি বলে ডাকবে বাবা?

গতকাল রাত থেকে প্রচন্ড মনে পড়ছে।ভিতরটা যেন দুমড়ে-মুষড়েযাচ্ছে
মুহূর্তেই, ভিতরটা গুমরে গুমরে কেঁদে উঠছে।বাড়িতে যখন আসতাম ,ফজরের আযান
দিলে তোমার ডাকে ঘুম ভাঙত- নামাজ পড়তে যাও।এখন কেন কেউ আর ডাকেনা?বাবা,
তুমি কোথায়? নামাজ থেকে ফিরে আসলে তুমি মাকে বলতে-মনির খিদে (ক্ষুধা)
লেগেছে,তাড়াতাড়ি খেতে দাও। আমি অনেক বকেছি যে,আমিতো ছোট নa –আমার খিদে
(ক্ষুধা)লাগেনি।তারপরও শুনতোনা।বাবা,এখন আমি যখন অফিস থেকে তোমার কবরের পাশ
দিয়ে বাসায় ফিরি বারেবারে তোমার কথা কানে প্রতিধ্বনিত হয়,যেন মাকেবলছো-
মনি বাসায় এসেছে,খেতেদাও।আগে বাড়িতে আসলে যখন গোরস্থানের পাশ দিয়ে
ফজরের নামাজ পড়তে যেতাম মনে মনে খুব ভয় করতো! হাজার হলেও গোরস্তান! আর এখন মনে হয় ভয় কিসের?এখানে
আমার বাবা আছেনা!আমার কোন ভয় নেই!

ডিসেম্বরের ৯ তারিখ
২০১২,শৈত্যপ্রবাহের কারনে হাড়কাপা শীত,কুয়াশা আরঅন্ধকার মিলে ভয়ংকর হয়ে ওঠা
সন্ধ্যারাতে বাবা বাড়ির পাশের ব্রিজ থেকে নিচেপড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত
হল। পাশের দোকানের লোকজন বাবাকে উঠিয়ে বাড়িতেনিয়ে গেল। খবর পেয়ে আমি ছুটে
গেলাম বাড়িতে।গিয়ে দেখি বাবার নাক, মুখ এবংকান থেকে অবিরত রক্ত ঝরছে আর
অসহ্য যন্ত্রণায় বাবা চিৎকার দিচ্ছে।বাবার এইঅবস্থা দেখে আমি একেবারে হতবাক
কারন তার শরীর থেকে এত রক্ত ঝরা আমি আর কখনওদেখিনি ।শীতের তীব্রতা আর
অন্ধকার উপেক্ষা করে বাবাকে নিয়ে ছুটে চললামহাসপাতালের
দিকে।মাথায়ব্যান্ডেজ, ডানহাতে স্যালাইনের ক্যানুলা আর ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা
জামা কাপড়দেখে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলামনা, দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায়
অশ্রুঝরছে-আর এই প্রথম বারের মত বাবাকে প্রচণ্ডভাবে অনুভব করলাম!একেএকে
মনে পড়তে লাগলো- ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে ছুটে বেড়ানো কিংবা আমারবালিশের
পাশে বাবার এনে রাখা সিঙ্গারা বা দানাদারের গুরুত্ব অথবা আমাকেনিয়ে তার
উচ্চাশা সবকিছুই, সবকিছুই মনে পড়তে লাগলো । কিন্তু ঐ শীতের রাতেআমি ছাড়া
বাবার অন্য পাঁচ ছেলের কেউই বাবার সাথে হাসপাতালে গেলনা।উল্লেখ্য-আমার
বাবার দুইটা পক্ষ(দুইটা স্ত্রী),আমার মা ছোট। আমরা দুই ভাই আর এক
বোনঅন্যদিকে ওরা পাঁচ ভাই আর এক বোন।সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাকি প্রকৃতির নিয়ম
জানিনাতবে,ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি আমার সৎভাইয়েরা আমাদের সাথে খুবই
জঘন্যব্যবহার করে আসছে(যদিও একজন একটু ব্যতিক্রম)।বাবার জমিজমা যা ছিল
আমাদেরকেতার কিছুই দেয়া হয়নি। তবুও আক্ষেপ ছিলনা কিন্তু বাবা যখন
হাসপাতালে, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তখনও তারা বাবাকে না দেখতে গিয়ে কেমন
করে পারে!!বাবারঅচল দেহ ছাড়া আমরা তো কিছুই পাইনি তবে আজ কেন তারা সবকিছু
পেয়েও সেইজন্মদাতাকে হাসপাতালে রেখে বাড়িতে আরামে দিনাতিপাত করে? যাহোক,
এগুলো আর নাবললেও হবে।বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার তিনদিন পরও আমরা কেউই
নিশ্চিতছিলাম না যে, বাবা আমাদের মাঝে আবার ফিরে আসবে, আবার নিজের পায়ে
উঠেদাঁড়াবে!। আমাদের প্রতিটি দিন কেটেছে অনিশ্চয়তায়, এই বুঝি বাবা আমাদের
ছেড়েচলে গেল! ছয়দিন হাসপাতালে থাকার পর ডাক্তারের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর
বাবাকে আমরা বাড়িতে নিয়ে আসলাম।তখনো ভাবিনি, বুঝিনি বাবার অনুপস্থিতির
ব্যথা কতো অসহ্য, কতো হৃদয়বিদারক !

গতমাসের ১১ তারিখরাত ১০টা ৫
মিনিট আমাদের বুক খালি করে তুমি অজানা পথে পাড়ি দিলে।ভাই-বোন,চাচা-চাচি
সবাইকে হয়তো ডাকতে পারবো কিন্তু আর কাকে বাবা বলে ডাকবো?বাবা,কিএমন অপরাধ
করেছিলাম আমরা যে- এই বয়সে তোমাকে হারাতে হবে।বাবা,তুমি চলে যাবার আগে
মাকেও কেন কিছু বলে  গেলেনা? মা প্রায়ই তোমাকে ভেবে মাঝরাতে কাঁদে।এতো
অভিমান তোমার? আমাকে নিয়ে তোমার কতো স্বপ্ন ছিল!আমার স্বপ্ননির্মাণে কে
সাথী হবে বাবা?বিশ্বাসকর বাবা-আমাকে নিয়ে এখন আর কেউ ভাবেনা ?তবুও,তোমাকে
ঠিকই ভেবে যাই হাজার ব্যস্ততায়,খুজে ফিরি হাজার লোকের ভিড়ে! অশ্রুসজল চোখে
তোমাকে বলছি-তুমি কি আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেনা?কে আমাকে মনি বলে ডাকবে
বাবা?

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)