অনুপ্রেরনা এক - বিশ্বাসের বীজ

অমুসলিম থেকে মুসলিম হলে তাদের মুসলিম হওয়ার গল্প সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনে। অথচ মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও ইসলামের দিকে আসার বা না আসার গল্প থাকে। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা, আমার নিজের এই পথ চলার কথা লিখব। আর কারও জন্য না হলেও নিজের জন্যই। জীবনের বাঁক ঘুরে যায় অনেক সময় খুব আপাত: ছোট খাট কারণে।সেগুলোর কথা ভুলে যেতে ইচ্ছা করে না একদম।

 

-------

 

মানুষের প্রথম স্মৃতি নাকি তিন চার বছর বয়সের স্মৃতি। সেই বয়সের হাতে গোণা কিছু স্মৃতি আমার মনে আছে। এর মধ্যে খুব সুন্দর একটা স্মৃতি হচ্ছে রাতে ঘুমানোর আগের প্রস্তুতির স্মৃতি। বাবা তখন আমাদের দুই ভাইবোনের ডাবল বেডটায় মশারি টাঙিয়ে গুঁজে দিতেন। তারপর বেতের চেয়ারটা বিছানার কাছে টেনে নিয়ে আমাদের ক্যালেন্ডারের পাতায় মলাট করা 'সীরাতে ইবনে হিশাম' থেকেগল্প শোনাতেন। রুদ্ধ শ্বাসে শুনে যেতাম সাহসী ছোট্ট আলীর গল্প, যে কি না রাসুল (সা) কে মদীনার পথেপালাতে দিয়ে দিব্যি তাঁর বিছানায় শুয়ে ছিলেন। কল্পনায়দেখতাম বালু বালু মরুভূতির ছোট্ট এক গুহায় আবু বকর আর মুহম্মদ (সা), গুহার মুখে মাকড়শার জাল। কিংবা নূহের গল্প… উফ সে কি ভীষণ বন্যা! ঝড়ে দুলতে থাকা জাহাজ, আর সেই জাহাজ বোঝাই মানুষ। পৃথিবীর কোথা্ও এক তিল ঠাঁই নেই…

 

গল্পশেষে বাবা তিন ক্বুল সূরা পড়ত সুর করে। তারপর প্রথমে আমাদের চারপাশে ফুঁ দিয়ে দিত।তারপর দুই হাতের তালুতে এক গাদা সুরা-ওয়ালা ফুঁ নিয়ে সেটা আমাদের চোখে, মুখে, গায়ে মেখেদিত। সেই ফুঁ-ওয়ালা আদরে কি এক যাদু ছিল, ঘুম এসে যেত নিমিষেই।

 

 

আল্লাহরনাম প্রথম কখন শুনি মনে নেই একদম। শুধু নিজের জীবনের প্রথমকালের সামান্য যেই স্মৃতিগুলো মনে আছে, সেখানে আল্লাহ সম্পর্কে চারটা কাহিনী মনে আছে।

 

মীরাহওয়ার সময় আমার বয়স মোটে চার বছর বয়স। সেই সময়েই মানুষের জন্ম নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র প্রশ্ন নেই। আমি তো জানিই, আবার প্রশ্ন করব কি?বড় হয়ে ক্লাস ওয়ান টুতে বন্ধুরা বলতো ওদের বাবা মা ওদের জন্ম সম্পর্কে কি কিবলেছে--একজনের মা বলেছে ওকে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। আরেকজনের মা নাকি ওকে হাসপাতাল থেকে কিনে এনেছে। এসব শুনে আমি অসম্ভব অবাক হতাম। কারণ জন্ম সম্পর্কে সেরকম উদ্ভট কথা আমি কখনও শুনি নি।বরং ছোটবেলা থেকেই জন্ম সম্পর্কে আমার চিন্তা ভাবনা একেবারে পরিষ্কার। অন্তত: আমি তাই জানতাম। আমি দিব্যি কল্পনা করতামবাবা মামনি শুয়ে আছে, আর আল্লাহ জীবরাইল (আ) কে দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এভাবেঅবশ্য মা বাবা কখনও গল্পটা বলে নি, জিজ্ঞাসা করার পরে বলেছিল, আমাকে আল্লাহ বানিয়েছেন এবং আমাকে আল্লাহ মা বাবার কাছে পাঠিয়েছেন।ওইটুকু থেকেই আমি আমার ছোট্ট মনে ঘটনাটা ওভাবে কল্পনা করে নিয়েছিলাম।

 

পরের দু'টো কাহিনী আল্লাহ আর প্রকৃতি নিয়ে। বাসায় মা বাবা যখন কুরআন তিলওয়াত করতো, তখন জোরে জোরে বাংলা অর্থ পড়তো। সেখান থেকেই কখনও শুনেছি, আল্লাহ রাতের বেলা পৃথিবীটাকে কালো চাদরেঢেকে দেন। সেই চার বছর বয়সে দিব্যি কল্পনা করে নিলাম আমাদের বারান্দায় টাঙানো কালোপর্দার মত আল্লাহরও একটা পর্দা আছে। রাত হওয়ার সময় হলেই সেই পর্দা দিয়ে আল্লাহপৃথিবী ঢেকে দেন। আমাদের বাসায় নীল রঙের বড় একটা গ্লোব ছিল। মা বাবা সেই গ্লোবে হলুদ রঙের ছোট্ট বাংলাদেশ চিনাতেন, গোলাপী রঙের আমার জন্মস্থান ইংল্যান্ড চেনাতেন, সেই থেকে জাতাম, পৃথিবী ওরকম--নীল আর গোল। আমি দিব্যি কল্পনা করতাম সেই গোল পৃথিবীর উপর আল্লাহ কিভাবে পর্দা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন। সেই পর্দা অবশ্য বেশ পুরানো, তাই সেখানে বড় একটা ফুঁটা আছে। যেহেতু পৃথিবীর বাইরে তখনও আলো, তাই সেই ফুঁটা দিয়ে আলো দেখা যায়। ওটাই চাঁদ। আর ছোট ছোট যেসব ফুঁটা আছে, সেগুলো হচ্ছে তারা।

 

বৃষ্টি নিয়ে চার বছর বয়সে যা ভাবতাম, সেটাওআমার স্পষ্ট মনে আছে। গোসল করার সময় বাবা শাওয়ার ছেড়ে দিত, আর অফ করে দিত। শাওয়ার ছাড়ার আগে কিছুক্ষন অল্প অল্প পানি পরে, তারপর জোরে। আবার বন্ধ হওয়ার সময় জোরে থেকে আস্তে। আমি দিব্যি কল্পনা করতাম আল্লাহর সেরকম বড় একটা শাওয়ার আছে। আল্লাহ সেইশাওয়ার ছেড়ে দিলেই বৃষ্টি হয়। প্রথমে বৃষ্টি আস্তে আস্তে হয়, কারণ শাওয়ারে জোরে পানি বের হতে তো সময়লাগবে, নাকি? একবার মায়ের সাথে ভাইয়্যুনকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে দেখি সেখানে বৃষ্টি পরেছে, কিন্তু আমাদের বাসার কাছে একেবারে খটখটে শুকনা। তখন নতুন উপলব্ধি হলো।আল্লাহর শাওয়ারটা আসলে বেশি বড় না তো, সেজন্য এক জায়গায় বৃষ্টি পরে, আরেক জায়গায় পরে না।

 

শেষ কাহিনীটা আল্লাহ নিয়ে প্রশ্ন করার কাহিনী। আমি কিছুতেই খেতে চাইতাম না। মুখে খাবার দিলেও সেটা গাল ভরে রেখে দিতাম, গিলতেকষ্ট হতো। খাওয়াতে খুব কষ্ট হচ্ছে বলে একবার খাওয়ানোর সময় মা বলছিল, খাবার নষ্ট করলে কিন্তু আল্লাহ গুনাহ দিবে।কেয়ামতের দিন, রেজাল্ট কার্ডের মত আমলনামায় সব লেখা থাকবে।

আমি ভেবে চিন্তে জবাব দিলাম, তাইলে আমি আমলনামা নিয়ে দোযখের আগুনে ফেলে দিব, তাহলেই তো হলো!

মামনি হেসে ফেলেছিল।

চিন্তাটাওপরিষ্কার করে দিয়েছিল।

 

ওই ছোট্ট ঘটনাটা মনে পড়লে কত কিছু মনে হয়। সবচেয়ে বেশি হয় মা বাবার প্রতি অশেষকৃতজ্ঞতা বোধ। জিজ্ঞাসার পথ, ভাবার পথ কখনও বন্ধ করে না দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ। বিশ্বাসের শেঁকড়টা মনে শক্ত করে গেঁড়ে দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ।

 

ছোটবেলা যেমন মাকে সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ মনে হতো, তেমন মা বাবার সব কিছুই ছিল ভালো আর সুন্দর।  

 

সেই বয়সের একটা দু:স্বপ্নের কথা বেশ মনে আছে। স্বপ্ন দেখেছিলাম, মামারা বাবার দাড়ি পছন্দ করে না বলে বাবা দাড়ি শেইভ করে ফেলেছে। বাবাকে আর চেনা যাচ্ছেনা। বাবা মায়ের বিয়ের সময়ের ছবিগুলোতে যেরকম অচেনা লাগে, সেরকম লাগছে। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি আকুল হয়ে কাঁদছি।

 

স্কুল শুরু করার আগে থেকে শুরু করে কেজি ওয়ান পর্যন্ত আমার প্রিয় খেলা ছিল কাজের মেয়েটা আর ভাইয়ার সাথে নানাবিধ অভিনয়। তখন আমরা জলচকিতে বই সাজিয়ে বইয়ের দোকান দিতাম। বেছে রাখা কালো কালো মরা চাল দিয়ে ভাত রান্না করতাম। ভাবী সেজে পাশের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম।বাসা থেকে বের হতে নিলেই (মানে বারান্দা থেকে রান্নাঘরে আসতে নিলেই)  অবশ্য মায়ের নীল স্কার্ফটা মাথায় দিয়ে মুখে নিকাব দিয়ে নিতাম। মায়ের একটা সিল্কের শার্ট ছিল বাদামী আর কালো স্ট্রাইপের।সেটা গায়ে দিলে আমার পা ছুঁই ছুঁই করতো। সেটাই হয়ে যেত আমার বোরখা।

 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)

ভাল উদ্যোগ। গতানুগতিক লেখার চাইতে এ জাতীয় লেখা পাঠকদেরকে একটু মনোযোগী রাখে পড়ার সময়।
আশা করবো দীর্ঘ করবেন। তবে পোষ্টের আয়তন ছোট রাখবেন। যাতে কয়েক নিঃশ্বাসে পড়া যায়। Smiling

ছোটবেলার চিন্তা ভাবনাগুলো সরল রেখায় চলে, বড় হয়ে আমরা বুঝতে পারি বাস্তবতা সরল রেখায় চলেনা। তাই ছোটবেলার চিন্তাগুলো হাস্যকর মনে হয়।

আমার কিন্তু খুব অবাক লাগে, কি সুন্দর করে পুরা সিস্টেমটা কল্পনা করে নিয়েছিলাম তখন! ছোটরা আসলে অনেক ভাবতে পারে! 

Laughing

হি হি হি  Tongue out
 দোজখে রেজাল্ট কার্ড ফেলার গল্পটা আগে শুনিনি তো!

এহ, বলি নি বুঝি? 
এখন শুনলা Smiling

সুন্দর স্ম্ৃতিচারন।

শৈশবে বিশ্বাসের বীজ, সারাজীবনে বিস্তৃত হয় যার চারা থেকে শাখা-প্রশাখা, জীবনের জন্য বড় পাওয়া।

-

"প্রচার কর আমার পক্ষ হতে, যদি একটি কথাও (জানা) থাকে।" -আল হাদীস

অনেক বড় পাওয়া! সেই সময়েই বীজ বুনে দেয়ার জন্য বাবা মায়ের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ আমি। 

এটা কি কোন (চলবে) জাতীয় লেখা?

-

আড্ডার দাওয়াত রইল।

> > > প্রতি শুক্রবার আড্ডা নতুন বিষয়ে আড্ডা শুরু হবে।

সেরকমই তো ইচ্ছা ছিল... 

sl

 

আজকাল  মা - বাবাদের কি সময় আছে বাচ্চাদের ইসলামিক কাহিনী শোনাবার ? কয়জন মা - বাবা ঘুমাতে যাওয়ার আগে সুরা পড়ে বাচ্চার গায়ে ফুঁ দেন ?  এসব বোধহয় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)